#২০_বছর_আগের_এই_দিনটি

0


ফেচবুক আপনাকে মনে করিয়ে দেয় বছর ৫ আগের দিনের কথাটি। কি করেছিলেন সেদিন। কিন্তু মানব নামের এই যন্ত্রটি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে পারে বছর ২০ আগের এই দিনটি..........


সকাল হয়েছিল মায়ের মধুর কণ্ঠের ডাক শুনে। সকাল হইছে উঠে পড় বাবা। আমি তখন সদ্য স্কুল যাওয়া শুরু করেছিলাম। রাতের খাবার খেয়ে সেই কখন ঘুমিয়েছিলাম, সকালের সাথে সাথে ভুলেই গিয়েছিলাম বুঝি। শীত আসছে এমন ক্ষণ। আমাদের ঘর ছিলো মাটির ডোয়ায় নির্মিত একটি শনের ছাউনিতে ঢাকা ঘর। সেই ঘরে মা, বাবা, আমি তিনজন থাকতাম। আরেকটি টিনের ঘর ছিল সেটাতে থাকতো আমার কাকা, দাদু, ঠাকুমা। তখন আমি একমাত্র সে এই পরিবারের আদর আলহাদে বেড়ে উঠছি। কাকা সেই সময়ের এস এস ছি পাশ করা এক যুবক। বাবার লেখাপড়া সুযোগ ঘটে নি। দাদুকে দেখেছি উনি প্রায় অসুস্থ থাকতেন বছর জুড়ে। তাই অন্তত সংসারের হাল ধরেছিলেন সেই কিশোর বয়সে। কাকার প্রিয় শখ ছিল রেডিও শোনা। বাংলা ছায়াছবির গান, অনুরোধের আসর গানের ডালি, দেশের গান, লোকগান,লালনগীতি সহ অনেক গান শুনেছি। তবে তখন এই রেডিও এতো জনপ্রিয় ছিলো সেটা বুঝাতে পারবো না। কারণ সমস্ত গ্রাম খুঁজে মাত্র হতে গোনা ৫ টা রেডিও আর ১ টি সাদাকালো টেলিভিশন ছিলো। রেডিও চ্যানেল বলতে বাংলাদেশ বেতার ঢাকা, আর খুলনা টাই বেশি জনপ্রিয় ছিলো। সন্ধ্যায় বি বি সি শুনতে পুরো গ্রামের মানুষ এক উঠানে ভরে যেতো। তখন বি বি সি এর খবর কে এতো বেশী বিশ্বাসযোগ্য মনে করতো সবাই যেনো দেবতা কতৃক ঘোষিত বাণী এক একটি। তখন টিভি দেখতে অনেক কষ্ট করতে হতো। অনেক চাপাচাপি করে বসে কোন রকম ফাঁক ফোঁকর দিয়ে যদি খানিকটা দেখা যায়, কারণ আমি তখন অনেক ছোট। টিভি প্রগ্রাম বলতে তখন মিনা কার্টুন, আকবর দ্যা গ্রেট, ম্যাকগাইভার, আর সিনবাদ।
জন্য কারণ আমি একাই ছিলাম রাজত্বে। ভীষন কষ্ট হতো যখন দেখতাম দাদুর হাঁপানি রোগটা বেড়েছে। রাতে ঘুমাতে পারতেন না। সারারাত জেগে থাকতেন। দাদুর শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিলো ক্লাস ৯। ইচ্ছে করলে অনেক বড় চাকুরী তখন মিলতো কিন্তু ওনার বাবা অকালে চলে যাবার দরুন উনি আর লেখাপড়া করার সুযোগ পান নি। এমন কি চাকুরী করতেও পারেন নি। তখন এমন সময় ছিলো চাকুরী মানে অন্যের গোলামী করা, বাড়ির ছেলে কোথায় গিয়ে থাকতে হবে এগুলা মনে করে কেউ ইচ্ছে প্রকাশ করতো না। আমি দেখেছি দাদুকে নিজের হাতে সুন্দর হাতের লেখা বিশিষ্ট ইনগিলাপ এর চিঠি লিখেছে কোন এক ওষুধ কোম্পানির কাছে হাঁপানি এর ওষুধ চেয়ে। তখন আমার একটি কাজ বেড়ে গিয়েছিল সেটা হলো চিঠিটা স্কুলে যাওয়ার আগে পোস্ট করে দিতে হবে। যথারীতি দিন অনুসারে ওষুধ চলে আসতো পোস্ট অফিসের ঠিকানায়। এনে দিতাম দাদুকে, কিছুটা কমতো অসুখটা আবার হটাৎ ওষুধ কাজ করতো না। আর আমি ভাবতাম কোন ঠিকানার কত দূর থেকে দাদু অসুখের বিবরণ দিয়ে ওষুধ নিয়ে এসেছে। এটাও সম্ভব। আমরা এখন অনেক অনেক এগিয়ে গেলেও এখন আর দাদু নেই। তার সাথে কথা বলতে পারি না স্কুলে নিয়ে যায় না কেউ। সত্যি বলতে কি দাদু চলে যাওয়ার পরে এমন ভাবে কেউ আমার লেখাপড়ার জন্য আমার বিদ্যালয় মাড়াই নি। আর যেখানে দাদু প্রতিটা দিন স্যারদের সাথে কথা বলতো আমার কিভাবে ভালো হবে আমি কেমন পড়াশোনায় মনোযোগী ইত্যাদি ইত্যাদি। কাকা মাঝে মাঝে খোঁজ নিতো তবে তার বাবা মানে দাদুর মতো করে কখনোই নয। দাদু চলে গেলে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলতে পারি নি। বুকটা পাথর হয়ে গিয়েছিল বুঝি তাই আজ খুব কান্না আসে মাঝে মাঝে সময়ে অসময়ে। তুমি ভালো থেকো দাদু।

আজ এই দিনে তোমার কাছে ক্ষমা চাই দাদু ভালো চিকিৎসা পেলে হয়ত আজও তুমি আমাদের সাথে থাকতে। পরপারে ভালো থেকো।
আর সিনবাদ। বাবার কাঁধে উঠে রাতে চলে যেতাম সীনবাদ দেখতে। সেখানে কেহেরমান নামে একটা ক্যারকটার ছিলো। আজও মনে পড়ে স্পষ্ট তার জাদুর কথা, সিনবাদের তলোয়ারের কথা। আমাদের আসল বিনোদন ছিলো মাঠে খেলাধুলা করা, ঘুরে বেড়ানো, গুলতি দিয়ে পাখী শিকার করা। তবে মনে পড়েনা একটা পাখির গায়ে বল লেগেছে কিনা? সকালে রোদে দাদুর হাতে বানানো বিলের পাতি দিয়ে বানানো মাদুর পেতে চিড়া গুড় আর না হয় মুড়ি গুর মেখে খেতে খেতে বই পড়ার কথা মনে পড়ে খুব।বই পড়ার জন্য মায়ের হাতে অনেক মার খেটেছি, বকুনি খেয়েছি। ওটাই ছিল আমার আশীর্বাদ স্বরূপ। আজকের প্রজন্ম জানে মুখে ভাতের আয়োজন কেমন হয়। অনেক মানুষ আসে দোয়া, আশীর্বাদ করেন, প্রচুর উপহার পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের এভাবে সুযোগ ঘটেনি। এক সকালে দাদু বললো আজ আমার নাকি মুখে ভাত। আমি তাকিয়ে আছি দাদুর দিকে, এটাতে খুশী না দুঃখ নাকি উপহার কোনটাই বুঝি না তখন। হটাৎ দাদু ওনার খাবার থালা থেকে এক দুই দানা ফেনাভাত আমার মুখে গুজে দিলো। মনে নেই তখন কেমন অনুভূত হচ্ছিলো আমার। এটাই ছিলো আমার মুখে ভাত অনুষ্ঠান। দাদু আজ নেই ২০০৬ সালে আমাদের ছেড়ে ইহলোকের মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে চলে গেছেন। খুব খুব মিস করি আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক কে। তিনি আমার প্রিয় দাদু।
দাদু প্রতিদিন বাজারে যেতেন। কেনো যেতেন আগে কোনদিনও বুঝিনি আজ বুঝি....আমাকে একা একা স্কুলে যেতে হবে এটা ভেবেই দাদু আমাকে বাজারে যাওয়ার নাম করে স্কুলে রেখে বাজারে যেতেন। যদিও তেমন বিশেষ কাজ তার বাজারে থাকতো না। আবার ফেরার সময় স্কুল হয়ে আমাকে সঙ্গে করে বাড়ি ফিরতেন। কখনও একা ছাড়েন নি আমাকে কারণ ছোট্ট বেলায় আমি খুবই ভীতু ছিলাম। সন্ধ্যায় ঘর থেকেই বেরুতাম না। দাদু বাজার থেকে ফেরার সময় প্রতিদিন ৪/৫ টা চকোলেট নিয়ে আসতেন শুধু আমার ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !