সেবার অনেক জল হইছিলো। মাঠ ঘাট সব জলের তলে। মাঠের ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, গরু সব কিছু। মানুষের অর্থাভাব দেখা দিলো।
দুর্গাপূজার সময়...প্রতিবছর এর মত ছোট পিসিমা কে আনতে ওনার শশুর বাড়িতে। নদীপথের যাত্রা টাই বেশ সকাল সকাল বাড়ি থেকে যাত্রা করলাম। সাথে একটা ব্যাগ মাত্র। তাতে আছে আমার একটা অতিরিক্ত জামা আর একটা ছোট প্যান্ট। বয়স আন্দাজ ১২ বছর হবে। পাড়াগাঁয়ের ছেলে তাই ছোট বেলা টা কেটেছে সকালে স্কুল আর বিকেলে মাঠের ফসলি জমির পাশে গরু চরিয়ে। বিকেলে গাদনড়ি অথবা মার্বেল খেলা। কখনও কখনও স্কুল থেকে ফিরেই বাঁশ ঝাড় এর পাশে গিয়ে বকের বাসার সন্ধানে উঠে পড়েছি বাঁশের কঞ্চি বেয়ে ডিমের সন্ধানে। আসলে তখনকার উন্মাদনা আর খুশির সেই অনুভব আজকাল কার ছেলেমেয়েরা পাবে না। তাই অগত্যা সাহস একটু বেশিই ছিলো বটে।পিসিমা নিয়ে ফিরছি নদীপথে। ওটাই ছিল তখনকার সময়ের সহজ পথ। স্থলপথ থেকে নদীপথে চলার অনেক মজা আছে বৈকি। একে তো অনেক জল হয়েছে সেবার তারপর নদীতে প্রবল স্রোত। ট্রলার চলছে একটি একটি ঘাট হলো এক একটি স্ট্যান্ড। যথারীতি একটি ঘাটে থামছে আবার নতুন যাত্রী উঠেছে কেউ নেমে যাচ্ছে।
যখন পৌঁছুলাম আমাদের নবগঙ্গা র পাশে তখন সন্ধ্যা রাত্রি প্রায়। নৌকা যথারীতি বাধা আছে ঘাটেই কিন্তু মাঝির দেখা নেই। অনেকক্ষণ হাক ডাক দেওয়ার পরও যখন উত্তর এলো না তখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম এবার আমিই বেয়ে নিয়ে যাবো। ওই তো মাত্র ছোট্ট একটি নদী। ছেড়ে দিলাম নৌকা বাইছি তো বাইচি কিন্তু তীরের দেখা নেই। সেই নদী পার হতে সময় লাগে মাত্র ২০ মিনিট সেখানে আমি বাইছি প্রায় ৪৫ মিনিট। আরেকটি ব্যাপার বলি সেদিন ছিলো অমাবস্যা রাত, রাতে জেলেদের মাছ ধরার নৌকা থাকার কথা থাকলেও আজ কেউ এখনো আসে নাই। নৌকা যেনো স্রোতের বিপরীতে চলছে তাই পথ এগোয় না। কি করা উপায় অন্ত খুঁজে পাই না। আমরা যে নদীর প্রায় ওপারে এসে পৌঁছেছি সেটা বুঝতে পারলাম নদীর পাশে বসবাস করা একটি বাড়ির কুপির আলোয়। হালকা আলোর রেখা অস্পট হয়ে নদীর দিকে মিশমিশে কালো অন্ধকার ভেদ করে বেরিয়ে আসছে। তখন কার দিনে বড়জোর হারিকেন কেই সর্বোচ্চ আলোর ব্যবস্থা বলে ধরা হতো। বড় অনুষ্ঠান হলে হ্যাচক লাইট এনে অনুষ্ঠান সমাপ্ত পর্যন্ত রীতিমত ভাড়া গুনতে হতো ১০০ টাকা। তেল নিজের শুধু হ্যাচাক লাইটের ভাড়া ১০০ টাকা রাত্রি। সে যাক আলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি বুঝি কিন্তু আলোর পথ রোধ করে বুঝি পিছন থেকে একটা হাসির শব্দ শুনতে পেলাম স্পট। পিসিমা আর পিসতুতো বোন ভয়ে জড়সড় হয়ে নৌকার মাঝখানে এসে বসেছে। গ্রীষ্মের সন্ধ্যা তাই সন্ধ্যার পরে নদীতে জোয়ার এসেছে। এদিকে জলে ছাপিয়ে আছে বন্যা।
কেউ একজন লণ্ঠন হাতে নদীর ঘাটে এসেছিলো। সেই মানুষ টা আমাদের আবিস্কার করে নদীর কিনারে নৌকার ওপর অচেতন অবস্থায়। তার পর মনে নেই কিছু।

