শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে চোঁখের পাশ দিয়ে অশ্রুর ধারা গড়িয়ে গেলো

0

 
আমাদের স্কুলের পাশের কল্যাণী দিদি

 

যখন সবে মাত্র ইস্কুল যাওয়া আরম্ভ করেছি। মনে নেই সেই প্রথম দিনের সঙ্গী কে ছিল। আমাদের শৈশবটা অন্য ১০ টা ছেলের থেকে আলাদাই বটে। একটি মেঠো পথ শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সমস্তই গায়ে মেখে আমাদের ইস্কুল যাওয়া। এক পেয়ে রাস্তা সরু আইলের ধারে শীতের মৌসুমে ক্ষেত ভরা খেসাড়ী কলাই, গরমে তিল, আর বর্ষায় পাট এর আবাদ হতো খুব। সময়ের পরিবর্তে কত্ত কিছু পাল্টে গেছে। জানিনা আজও কেউ বুঝি নতুন স্কুলের যাত্রার জন্য আমাদের ওই পথের ধারে এই সমস্ত শৈশবের খুশী আর উচ্ছাস খুঁজে পাবে কিনা। শীতে স্কুল থেকে ফিরতে বিকেলবেলা এক মুঠো কলাই শিম তুলে নিয়ে বন্ধুদের সাথে সমস্ত নতুন জল্পনা কল্পনার গল্প আর শিমগুলো গলধঃকরণে বাড়ি ফেরা। গরমের একটি একটি  দিন ছিলো  আমাদের আনন্দের আর সীমাহীন খুশীর ভান্ডার। স্কুল থেকে ফিরছি হাতে কিছু তিলের পাতা আর ইতিহাস এমন যে গরমে মাথা যাতে ঠান্ডা থাকে এই উদ্দেশ্যে তিলের পাতাকে বাড়িতে নিয়েই একটি পাত্রে রেখে জল দিয়ে ভিজিয়ে রাখা এবং এক দুপুর উন্মুক্ত পুকুরে বন্ধুদের ডুবসাঁতার সাথে লাল চোঁখের পরিশেষে তিলের পাতা সম্বলিত নির্যাস মাথায় এবং সমস্ত গায়ে মেখে নিয়ে গরমের তপ্ততার থেকে একটি ঠান্ডার শিহরণে প্রবেশ করার একটি রণকৌশল এর মতো। জানিনা ঐগুলো কি ছিলো তবে মনের ওই গভীর বিশ্বাস এর শৈশবের কর্মকান্ড আমাদের অনেক প্রশান্তি দিয়েছে। কখনও সাবান বা শ্যাম্পুর বদলে মাথায় দিয়েছি লালমাটির আস্তরণ। তাতে নাকি চুল কালো আর সিল্কি হয়। জানিনা সেদিন আমাদের চুল সিল্কি হয়েছে কিনা তবে আমার এই অনুভব আর সেই সমস্ত দিনের গহীনতা হৃদয়ের মাঝে একটি সুখের সিল্কি ভাবের অনুরণন সৃষ্টি করছে।

বিকেলের ডাঙ্গুলি অথবা গাদনড়ি এগুলোই ছিলো আমাদের আসল খেলা। আজকের এই মোবাইল গেম, ইন্টারনেট সমস্তই আমাদের কাছে কল্পনাতীত ছিলো। বিকেলে কখনও উজ্জ্বল দাদাদের আঙিনায় ৭ চাড়া, বোমবাস্টিং অথবা ফুটবল খেলেছি। সালটা ২০০০ মনে পড়ে কি তোমাদের সেদিন নাকি পৃথিবী ধ্বংসের আলামত ছিলো। সমস্ত দিন সূর্যের দেখা পাওয়া না যাওয়ায় আমাদের সেই দিনটা যে কত কষ্টে কেটেছিলো বলে বোঝানো যাবে না। বিকেলে ফুটবল খেলাটাও পন্ড হয়েছিলো যতদূর মনে পড়ে। তখন আমাদের বন্ধু কিংবা খেলার সঙ্গীগুলো ছিলো কারা কারা?


সুব্রত,উজ্জ্বল,অনীতোষ, লিটন, সুজল আর আমি আরও মাঝে মধ্যে গলির ওপার থেকে কিছু ছেলে আমাদের সাথে যোগ দিতো। একটি টর্স লাইট কিনেছিলাম একবার মেলা থেকে দাম মাত্র ২৫ টাকা দিয়ে। ২ টি পেন্সিল ব্যাটারী দিয়ে চালানো যেতো লাইটটি। সন্ধ্যার সময় লাইট নিয়ে গল্পের আসরে এসে যোগ দিতাম পশ্চিম পাড়ায় নির্মল জ্যাঠামশাই এর কাছে। বড় ঠাকুমাদের রান্না ঘরের বারান্দা আর আমরা গুটিকতক ছেলে মেয়ে গল্পের আসরে কখনও ভয় কখনও সাহস আবার কখনও কেঁদে ফেলেছি। আর হ্যাঁ নিশ্চই জ্যাঠামশাইকে সবার মনে আছে কিনা জানিনা। ওনার আত্মার শান্তি কামনা করছি। আমাদের এডভেঞ্চার আর শৈশবের গল্পের প্লট তুমি সাজিয়েছিলে তুমিই আমাদের প্রথম শিক্ষক। ছোট বেলা থেকেই দেখেছি জ্যাঠামশাই খুঁড়িয়ে হাঁটেন। তাই সবাই ওনাকে খোঁড়া  জ্যাঠা বলে সম্মোধন করতেন।

সকালের বইপড়া, দুপুরের আমতলায় বসে খোশগল্প,জামের শাখায় উঠে একদম গলা আটকে না যাওয়া পর্যন্ত গাছ থেকে না নামার ইতিহাস। রাতের খাবার খাওয়ার আগ মুহূর্তে পাড়ায় পাড়ায় ডাকাডাকির চিৎকার।  বাবা বাড়ি এসো ভাত খেয়ে যাও। আহারে আমার শৈশব।

মনে পড়ছে আমার প্রাইমারী ইস্কুল, স্কুলের পাশের সেই বাঁশ বন আর পাশের কল্যাণী দিদির বাড়িটা তার পাশের ছোলম গাছের কথাটা। তারপর মনে পড়ছে ইস্কুলের পাশের বন্ধু আর বান্ধবদের কথা। তারা কে কি করছে কোথায় আছে কেমন আছে? আমার মতো তারাও কি আমাকে মনে করে? তারপর কত হাজার দিন গেছে কত বন্ধু, কত শহর, কত্ত পথের পথিক এই মন, সমস্তই গাঁথা আছে মনে। তবে সেই শৈশবেই আমার আমিকে হারিয়ে ফেলি বারে বারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !